উত্তরবঙ্গ বন্যা ২০১৭

২০১৭ সালটি কোনো ভাবেই পশ্চিমবঙ্গের জন্য ভালো যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক না না সমস্যায় এই শান্তির রাজ্যটি আজ বিদ্ধস্ত হয়ে পড়েছে। চা শ্রমিকদের বহুদিন ধরে চলতে থাকা আর্থিক দুর্দশার সমস্যা, না না রাজনৈতিক হানাহানি তো দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিনত করতে বাধ্য হচ্ছে রাজ্যবাসী। তার মধ্যে ইদানীং কালের প্রধান দুটি হিংসাত্মক পরিস্থিতি রাজ্যকে সম্পূর্ণ ভাবে দিশাহীন করে দিয়েছে, ১) পাহারের গোর্খা ভাইদের পৃথক রাজ্যের দাবীতে আণ্দলন (বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অগনতান্ত্রিক), ২) রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লাভের আশায় দুটি পৃথক সম্প্রদায়ের মধ্যে অযথা সমস্যা তৈরি হচ্ছে কোথাও কোথাও, যা একেবারেই সাধারণ মানুষের জন্য হিতকর নয়।

আজকের প্রসঙ্গটি হল আরও এক গভীর সমস্যাকে লক্ষ্য করে। একটি দেশ অথবা রাজ্য চলে প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে, আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে একজন ভারতবাসীর নিরপত্তা প্রদান করা রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র সরকার উভয় পক্ষেরই সমান দায়িত্ব। আর এখানেই সাম্প্রতিক কালের বন্যা, বিশেষ করে উত্তর বঙ্গের ভয়াভয় বন্যা সাধারণ মানুষের মনে কিছু প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।

দক্ষিনবঙ্গের সাথে উত্তর বঙ্গের প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্ভর করে ৩৪নং জাতীয় সড়ক ও একমাত্র সিঙ্গল-লাইন রেলপথের মাধ্যমে। তাই উত্তরবঙ্গের লোকেদের রাজ্য-রাজধানীতে পৌছানোর একমাত্র সহায় এই দুটি পথ-ই। ঠিক তেমনই জরুরী অবস্থায় এই পথের ওপরই সাধারন নাগরিক থেকে প্রশাসন সবাই নির্ভরশীল। অনেকদিন থেকেই অনেকের দাবী বিকল্প আরেকটি সড়কপথ ও রেলপথের কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারনে রাজ্য সরকার সহ কেন্দ্রীয় সরকার এই ব্যপারে উৎসাহী নয়! এবারের উত্তরবঙ্গের বন্যা এই বিভেদ নীতির পরিনাম যে কি হতে পারে ভালোভাবেই নির্দেশ করে দিল। গত কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টি এবং পরবর্তী বন্যায় কয়েক কোটি লোককে শুধু প্রশাসনের যে নির্বিকরতা দেখতে হল তার প্রধান কারনেই রয়েছে এই যোগাযোগ ব্যবস্থার শোচনীয় হাল। কিষানগঞ্জের কাছে ভেঙ্গে যাওয়া সুদানী নদীর রেল ব্রিজ এবং ৩৪নং জাতীয় সড়ক জলে ডুবে যাওয়ার ফলে উত্তরবঙ্গ সহ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে বাকি অংশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং কবে সাভাবিক হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। সাধারন মানুষে এই বিপর্যয়ে বন্যা দুর্গতদের পাশে যেভাবে দাড়ালো, তা যদি না হত পরিস্থিতি যে কি ভয়ঙ্কর রূপ নিত তা কল্পনাতীত কারন সিংহভাগ স্থানেই প্রশাসনের আশ্বাসটুকুও অমিল। কোনো দোষারোপের জন্য এই লেখাটি লিখতে বসিনি (সেটি রাজ্নৈতিক ব্যক্তিদের কর্তব্য), আজকের এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য কয়েকটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

  • বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী উত্তরবঙ্গ একটি জটিল ভৌগলিক অবস্থানে অবস্থিত, যা ভুমিকম্প প্রবন এলাকা জোন-4 এ পরেছে (বিপদ সীমার গুরুত্ব বিচারে যা জোন-৫ এর পরেই)। এই এলাকায় যে কোনো সময় ৭-৯ কম্পন মাত্রার ভুমিকম্প হতে পারে। খড়্গপুর আই-আই-টি বিশেষ পর্যবেক্ষক দলের বিঞ্জানীরা বার বার রাজ্য এবং কেন্দ্রকে সতর্ক করে দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হল সাধারন একটা বন্যার মোকাবিলা করতেই যদি এই হাল হয় তো সে’রম পরিস্থিতি হ’লে আশঙ্কা উত্তরবঙ্গের মানুষ কি করবে!
  • উত্তরবঙ্গ তিনটি আন্তর্জাতিক সীমনার মাঝে অবস্থিত। প্রতিবেশি চীন সহ নেপালের মাওবাদীদের দ্বারা এই অঞ্চলে যে কোনো সময় বড়সর নাশকতা ঘটতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের কাছে!
  • আর কতদিন এভাবে উত্তরবঙ্গকে দক্ষিনবঙ্গ থেকে অনেক পিছিয়ে রাখা হবে, যেখানে আস্তে আস্তে বঞ্চনার দোহাই দিয়ে আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলি মাথা তুলছে!

সাধারণ মানুষ খুব আশাবাদী হয়, একটাই আশা এবারের বিপর্যয়গুলি থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার দ্রুত সমস্যাগুলি সমাধানে এগিয়ে আসবেন।

– NIladri Pal

Advertisements